মোবাইটা সাইলেন্ট করা ছিল। রাতে শোবার আগে যখন ফোনটা হাতে নিলাম দেখি ৫৭ টা মিস কল ।
একটা নম্বর থেকে না, অনেকগুলো নম্বর থেকে- পরিচিত অপরিচিত নম্বর।
কী এমন দরকার হল আমাকে কে জানে? আগে কাকে ফোন করবো তাই ভাবছি এমন সময় সুমন এসে ঢুকল ঘরে।
“ফোন ধরিস না ক্যান ?”
“আরে সাইলেন্ট ছিল। বুঝতে পারি নি । কী হয়েছে । এতো বার ফোন দিছিস ক্যান?”
“ত্বন্নী সুইসাইড করেছে।”
“মানে? কী বলছিস?” বুকের মধ্যে কেউ যেন কেউ একটা ছুরি ঢুকিয়ে দিল।
“মানে, করার ট্রাই করেছে। হাসপাতালে আছে। তোকে বার বার দেখতে চাইছে।”
“মানে, এখনও মরে নি।”
“এমন ভাবে বলিস না প্লিজ।”
“কেন বলব না? আর তুই আমার কাছে কেন এসেছিস? ও আমার কে? ও বাঁচল কি মরল তাতে আমার কী যায় আছে?”
“অপু প্লিজ, এতো জেদ ধরিস না। তুই কি ওকে ভালবাসতিস না?”
“বাসতাম। আর বাসতাম বলেই আজ ওকে ঘৃনা করি। তুই তো জানিস ও আমার সাথে কী করেছে।”
সুমন কিছু বলল না। মোবাইল বের করে কী যেন করল। তারপর আমার দিকে মোবাইলটা দিয়ে বলল, “এটা দেখ।”
“কী এটা?”
“ত্বন্নীর শেষ ফেসবুক স্টাটাস।”
আমি ফোনটা হাতে নিলাম। ওটাতে লেখা “আই এম সরি অপু, আমাকে তুমি ক্ষমা করে দিও।”
আমি মোবাইলটা ওকে ফিরিয়ে দিলাম। আমার কোন ভাবান্তর হতে না দেখে সুমন বলল “তুই কি বেচারীকে এখনও ক্ষমা করবি না?”
“কোন দিনও না। আর তুইতো আমাকে ওর আসল চেহারার কথা বলেছিলি।”
“বলেছিলাম। কিন্তু ও বদলেছে।”
“ও বদলেছে কিন্তু আমি বদলাই নি।”
“ও যদি আজ মরে যায়?”
“মরবে না। ওমন মেয়েরা এতো সহজে মরে না। আর আগেই বলেছি ও বাঁচল বা মরলো আমার তাতে কিছু যায় আসে না। তুই এখন যা। তোর সাথে কথা বলতে ভাল লাগছে না।”
অনিচ্ছা সত্ত্বেও সুমন চলে গেল।
আমি লাইট বন্ধ করে শুয়ে পড়লাম। কিন্তু শুয়ে পড়লেই কি আর ঘুম আসে? আমার মনের ভিতর তোলপাড় চলছে। ত্বন্নীকে নিযে তোলপাড়। যতই মুখে আমি জেদ দেখাই মনের ভিতর ওকে নিয়ে দ্বিধা দ্বন্দ্ব চলছেই। কী করব আমি ? ও আমার সাথে যাই করুক না কেন ভাল তো বাসি ওকে।
ত্বন্নী । ফারহাধা জাবিন ত্বন্নী । আমাদের ক্লাসের সব থেকে স্মার্ট মেয়ে । সব থেকে সুন্দর মেয়ে । আর সব থেকে অহংকারী মেয়ে । ওরিয়েনটেশনের প্রথম দিন ত্বন্নী নিজের উপস্থিতি আর গুরুত্ব খুব ভাল করে সবাইকে বুঝিয়ে দিয়ে ছিল । উপরের ক্লাসের ভাইয়ারা তো ছিলোই আমাদের ক্লাসের মোটামুটি সবাই ত্বন্নীর উপর ফিদা ছিল । এবং সত্যি কথা বলতে কি আমি নিজেও ছিলাম । ও যখন ক্লাসে আসতো যেন এক ঝড়ো বাতাস মনের মধ্য বয়ে যাচ্ছে । যথন ওর সাথে দেখা হত মনের ঘরে যেন হাজারো বেহালা বেজে চলত । কিন্তু ওকে পাবার স্বপ্ন ওর সাথে বন্ধুত্ব করা এমন কি ওর সাথে কথা বলার কথাও ভাবতাম না কোন দিন ।
কিভাবে ভাবতাম ? ও হল একটা পারফেক্ট মেয়ে । সবার মনের রানী আর আমি ক্ষুদ্র প্রজা । গ্রাম থেকে আসা ক্ষ্যাত মার্কা একটা ছেলে । ওর ধারে কাছে যাবার প্রশ্নই আসে না । আমি যেতামও না । এভাবেই চলে যাচ্ছিল জীবন ।
কিন্তু একদিনের কথা । আমি ক্লাস শেষে হলের দিকে যাচ্ছি ।
এমন সময় পেছন থেকে ডাক “অপু একটু দাঁড়াবে ?”
কণ্ঠ শুনে মনে হল দম বন্ধ হয়ে মারা যাবো ।
ত্বন্নীর মুখে নিজের নাম কখন যে শুনবো এটা আমি কোন দিন আশাই করি নি । আমি দাড়ালাম ।
“হাই।”
এতোটাই নার্ভাস হয়ে পড়লাম যে হ্যালো টাও বলতে পারলাম না । কোন রকম একটু হাসার চেষ্টা করলাম । ত্বন্নী খুব স্বাভাবিক ভাবেই আমাকে বলল “তোমার সাথে কিছু কথা বলতে পারি?”
“বল।”
“একচুয়ালী কথা না, অভিযোগ। তোমার বিরুদ্ধে আমার অভিযোগ আছে।”
“অভিযোগ ?” আমি অবাক হই ।
“তুমি আমাকে এড়িয়ে চল কেন ?”
কিছুই বলতে পারলাম না । বোকার মত তাকিয়ে থাকা ছাড়া । তাছাড়া আমার বিশ্বাসই হচ্ছিল না যে ত্বন্নী আমার সাথে কথা বলেছে ।
সেইদিন রাতে ঘুম তো আর আসেই না । কত কিছুই না মনের জানালায় উকি মারে । মন ছুয়ে যায় কত অজানা রঙে । তারপর আসতে আসতে ত্বন্নীর সাথে যোগাযোগ বেড়ে যায় । মোবাইলে কথা হতে থাকে ঘন্টার পর ঘন্টা ।
পড়ব পড়ব না করেও আমি ওর প্রেমে পড়ে যাই । জীবন যেন এক নতুন পথে চলতে থাকে । যে পথে কেবল ত্বন্নী ছাড়া আর কিছুই নেই ।
আমি ভাসতে থাকি নতুন স্বপ্নে । কিন্তু স্বপ্ন ভাঙ্গতে সময় লাগে না । আমার ও লাগলো না ।
যে দিন আমি ঠিক করেছি যে ওকে বলব সেদিন সব যেন কেমন অন্যরকম হয়ে যায় । সকালবেলা ফুরফুরে মেজাজ নিয়েই নাস্তা খাচ্ছি এমন সময় সুমন কে আসতে দেখলাম । ওর মুখ থমথমে ।
আমি বললাম “কী হয়েছে ?”
“তোর সাথে কথা আছে ।”
“বল ।”
”এখানে না । আয় আমার সাথে ।”
বলে এক প্রকার জোর করেই আমাকে নিয়ে গেল ওর রুমে । নাস্তাও ঠিক মত শেষ করতে দিল না । আমরা মুখোমুখি বসলাম ।
“তোকে একটা কথা জিঞ্জেস করবো সরাসরি উত্তর দিবি ।”
আমি বললাম “আচ্ছা দিবো । কি হল এমন ?”
“তুই কি আজকে ত্বন্নীকে প্রোপোস করার কথা ভাবছিস ?”
আমি খানিকটা চমকালাম । ইতস্তর করে বললাম “তুই কিভাবে জানিস ?”
“শুধু আমি না পুরা ভার্সিটির সবাই জানে এটা । তুই কি বুঝতে পারছিস না ত্বন্নী তোকে নিয়ে খেলা করছে । তোর কি মনে হয় ও সাথে মিশছে কেন ? তোর কোন আইডিয়া আছে ?”
আমি কোন কথা বলতে পারি না । সত্যি তো আমার তো কিছুই নেই যে ও আমার সাথে মিশবে ।
সুমন বলল “ত্বন্নী ওর বান্ধবীদের সাথে বাজি ধরেছে যে তোকে ওর প্রেমে ফেলবে । তারপর সবার সামনে তোকে হেয় করবে । আজ সবাই রেডি হয়ে আছে মজা দেখার জন্য ।”
আমি নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না । মানুষ এমনটা কেমন করে করে ? কারো ইমোশন নিয়ে কিভাবে খেলে ?

ভেবেছিলাম ত্বন্নীকে দেখতে যাবো না । কিছুতেই যাবো না । কিন্তু না গিয়ে পারলামও না ।
ত্বন্নীর ভাই এসেছিল । এমন ভাবে অনুরোধ করতে লাগলো । আমি না করতে পারলাম না কিছুতেই । আর না যাওয়াটা অমানবিক হত ।
ওর অবস্থা নাকি খুব ক্রিটিক্যাল । দু এক বার নাকি চেতনা এসেছিল । বার বার নাকি আমার নাম নিয়েছে !
গাড়ি চলছে হাসপাতালের দিকে আর আমি ভাবছি ত্বন্নীর কথা ।

সেদিন সুমনের কাছ থেকে সব শোনার পর আমার সব কিছু যেন ওলটপালট হয়ে গেছিল । আমার কাছে মনে হচ্ছিল যেন আমি আর এই পৃথিবীতে নাই। একজন মানুষ আর একজনের সাথে এমনটা কেমন করে করতে পারে ? আমার মনটা কি একটা বাজির সমান ? এতোটাই ছোট আমি ?
তবুও ভার্সিটিতে গেলাম । ত্বন্নী যেন আমার জন্যই অপেক্ষা করছিল ।
ওর সামনে যখন দাড়ালাম তখনও আমার বিশ্বাস হচ্ছিল না যে এত সুন্দর একজন মানুষ আমার সাথে এমন একটা ঘৃন্য খেলা খেলতে পারে ।
ত্বন্নী আমাকে বলল “এতো দেরী হল কেন ? আমি কতক্ষণ ধরে তোমার জন্য ওয়েট করছি ।”
তারপর হেসে বলল “তুমি যেন কী আমাকে বলবে আজ ?”
আমি কিছুক্ষন কোন কথা বলতে পারলাম না । তারপর বললাম “কত টাকা বাজি ধরেছো ?”
“সরি?”
ত্বন্নীকে একটু চমকাতে দেখলাম । ও মনে হয় আমার কাছ থেকে এটা আশা করে নি ।
“সরি আমি বুঝতে পারলাম না তুমি কি বললে ?”
আমি বললাম “তুমি তোমার বান্ধবীদের সাথে কত টাকা বাজি ধরেছো ?”
“বাজি ?”
“হ্যা। বাজি । আমাকে প্রেমে ফেলানোর বাজি । আমাকে নিয়ে খেলা করার বাজি ।”
কিছুক্ষন ত্বন্নী কোন কথা বলতে পারলো না ।
“শোন অপু তুমি যেমনটা ভাবছো তেমন না । আই ক্যান এক্সপ্লেইন ।”
“আমি কোন ব্যাখ্যা শুনতে চাইছি না । আমি শুধু জানতে চাই তুমি বেট ধরেছিলে কি না?”
ত্বন্নী কিছুক্ষন কোন কথা বলল না । তারপর মাথা ঝাকালো ।
কী জানি হয়ে গেল আমার ! মাথা যেন আগুন ধরে গেল । কষে এক চড় মেড়ে বসলাম ।
“আমি কখনও ভাবিও নি তুমি এমনটা করবে ! এতো সুন্দর চেহারা তোমার । মনটা এতো কুৎসিত কেন ? আমার নিজের উপর ঘৃনা হচ্ছে যে তোমাকে আমি ভালবেসেছি ।”
কথাগুলো ওকে কিভাবে বলেছিলামকে জানে । তারপর চলে আসি ওখান থেকে ।
পরের এক সপ্তাহ বলতে গেলে একেবারে দুরে ছিলাম সবার কাছ থেকে । কারো সাথে কোন যোগাযোগ করি নি । একাই নিজের মন বুঝ দেওয়ার চেষ্টা করছিলাম । তারপর যখন ক্লাসে গেলাম সবাই যেন আমাকে একটু অন্য চোখে দেখতে লাগল ।
ত্বন্নীর মত মেয়েকে যে আমি চড় মেড়ে বসব এই কথা হয়তো কেউ ভাবে নি । সবার কথা বলছি কেন আমি নিজেই তো ভাবি নি । নিজের ক্লাস রুমটাকে কেমন জানি অচেনা লাগছিল । কদিন আগেও জীবনটা কত সহজ ছিল । আর এখন জীবনটা কত জটিল হয়ে গেলো । ত্বন্নী আসলো তারও কিছুক্ষণ পরে। আগের মত হাসি খুশি না । আজ আর চেহারায় সেই আত্মবিশ্বাসের হাসি দেখতে পেলাম না । তারপর এভাবেই দিন চলে যাচ্ছিল ।
সব কিছুই ঠিক ছিল কিন্তু আগের সহজ সরল জীবনের সুর কেটে গিয়েছিল । আস্তে আস্তে এটাই স্বাভাবিক হয়ে উঠল ।
তারপর একদিন । সেদিন খুব বৃষ্টি হচ্ছিল । কেউই বলতে গেলে আসে নি । একটা ফরম জমা দিতে হবে বলে আমি এসেছিলাম । না হলে আমিও আসতাম না । হেডফোনে গান শুনছিলাম আর বৃষ্টি দেখছিলাম ।
এমন সময় দেখি ত্বন্নী আমার দিকে আসছে । প্রথম ওকে ইগনোর করা চেষ্টা করি । কিন্তু লাভ হয় না । ও আমার সামনে এসেই বসে । ইশারায় হেড ফোন খুলতে বলে । একসময় ছিল ওর সাথে কথা বলার জন্য মন টা সবসময় অপেক্ষা করে থাকতো । কিন্তু আজ প্রেক্ষাপট ভিন্ন ।
আমি উঠে চলে যেতে চাইলাম । ও আমার পথ আটকালো । বললাম “সমস্যা কী ?”
“তোমার সমস্যা কী ? আমাকে কিছু বলার সুযোগ তো দিবে নাকি ! অন্তত ক্ষমা চাওয়ার সুযোগ তো দিবে ?”
“ক্ষমা চেয়ে কী করবা তুমি ? কোন দরকার আছে ?”
“আছে ।”
“কোন দরকার নাই । কোন লাভ নাই । কারণ আমি কোন দিন তোমাকে ক্ষমা করবো না । কোন দিনও না । তোমার মত মেয়ের সাথে কথা বলতেও আমার ঘৃণ্ণা হচ্ছে । পথ ছাড়ো । যেতে দাও ।”
ত্বন্নী কিছু বলতে গিয়েও আটকে গেল । এতো কঠিন কথা শুনে ওর অভ্যাস নেই । দেখলাম ওর চোখে দেখলাম পানি জমতে শুরু করেছে ।
জল ভরা চোখ নিয়ে ও বলতে লাগল “একথা সত্যি যে তোমার সাথে আমি মিশতে শুরু করেছিলাম বেট ধরেই । কিন্তু বিশ্বাস কর তোমার সাথে মেশার সময় আমার মন আস্তে আস্তে বদলাতে শুরু করেছিল । আমি সত্যি সত্যি আমাদের রিলেশনটা স্থায়ী করতে চেয়ে ছিলাম । আমি তোমার উপর সত্যি সত্যি ফল করতে শুরু করেছিলাম । ইনফ্যাক্ট আই হ্যাভ অলরেডি ফলেন ইন লাভ উইথ ইউ । আর এই কয়দিনে তুমি আমি আরো বেশি বেশি তোমার প্রতি দুর্বল হয়ে পড়েছি । অপু প্লিজ আমার কথা টা বিশ্বাস কর ।”
খুব ইচ্ছা করছিল ত্বন্নীর কথা গুলা বিশ্বাস করি ! কিন্তু বেলতলায় একবার যাওয়াই ভালো ।
“কথা শেষ হয়েছে তোমার?”
ও কিছু না বলে আমার দিকে তাকিয়ে থাকলো আহত চোখে ।
“তুমি বিশ্বাস করছ না আমার কথা ?”
“করার কোন কারণ নেই । আর শোন তোমার কেবল মনে হচ্ছে যে তুমি আমার প্রেমে পড়েছ । আসলে তা কিন্তু না । সারা জীবনে তুমি কখনও কারো কাছ থেকে রিজেক্টেড হও নি তো তাই তোমার এমন মনে হচ্ছে । আমি করেছি । তোমার আগে পিছে সব সময় তুমি ছেলেদের ঘোরাফেরা করতে দেখেছ ! আমি করছি না তাই আমার প্রতি তোমার আকর্ষন জন্মেছে । আর এটাকে আর যাই বলুক ভালবাসা বলে না!”
“অপু ……. “
ত্বন্নী আরো কিছু বলতে চাইছিল কিন্তু আমি ওকে সুযোগ দিলাম না ।

গাড়ি থেমে গেছে । মনেহয় চলে এসেছি । হাসপাতালে…..।
হাসপাতাল আমার কোন কালেই পছন্দ না । কিন্তু এই হাসপাতাল টাকে ঠিক হাসপাতালের মত মনে হচ্ছে না । মনে হচ্ছে কোন নির্জন বাগান বাড়িতে চলে এসছি । পুরো হাসপাতাল জুড়ে এক আলো আধারির খেলা ।
ত্বন্নীঁকে রাখা হয়েছে চার তালার কোন একটা কেবিনে । লিফটে থেকে বের হয়ে যেন অন্য জগতে চলে এলাম । চারিদিকে আলোর বন্যা । পুরো করিডরে অসংখ্য মানুষ । তার মধ্যে আমাদের ক্লাসের অনেকে আছে ।
আমাদেরকে আসতে দেখে দেখলাম এক মাঝবয়সী ভদ্রলোক আমাদের দিকে এগিয়ে এল ।
“তুমি অপু ?”
আমি কোন কথা বললাম না । কেবল একটু মাথা নাড়লাম ।
“এসো আমার সাথে ।”
আমি খ্যাল করলাম করিডরের প্রত্যেকটা চোখ আমার দিকে নিবদ্ধ । কেমন জানি অসস্তি লাগছিল আমার । ভদ্রলোক আমাকে ত্বন্নীর কেবিনে নিয়ে গেল।
ত্বন্নী তখন চোখ বন্ধ করে আছে । একজন ডাক্তার যেন কি একটা কাগজ দেখছিলেন ।
আমাদের ঢুকতে দেখে বললেন “আর কিছুক্ষণের মধ্যে সেন্স আসতে পারে ।”
ভদ্রলোক বললেন ডক্তর, “এ হল অপু ।”
“ওকে ফাইন । ও কেবিনেই থাকুক । সেন্স ফিরে যদি ওকে দেখে তাহলে পেসেন্ট মেন্টালি সাপোর্ট পাবে । আর এখন করো থাকার দরকার নেই । ওকে ? আর কোন সমস্যা হলে তো আমরা আছি ।”
এই কথা বলে ডাক্তার চলে গেলেন ।
ভদ্রলোকও চলে গেলেন । তবে চলে যাওয়ার আগে আমাকে বললেন “আমার মেয়েটা খুব জেদি । যখন যা চেয়েছে তাই পেয়েছে তো তাই এমন হয়েছে। জোর দিয়ে কিছু বলার অধিকার তো আমার নেই কেবল তোমাকে অনুরোধ করতে পারি ।”
বলতে বলতে ভদ্রলোক কেঁদে ফেললেন । আমি খুব অস্বস্থির মধ্যে পড়লাম ।
“ত্বন্নী সারা জীবন যা চেয়ে আমি তাই ওকে এনে দিয়েছি । কিন্তু এবার ও এমন কিছু চেয়ে যা আমার সামনে থাকা সত্তেও আমি ওকে এনে দিতে পারছি না ।”
আমি কি বলব বুঝতে পারছিলাম না । ভদ্রলোক আর কিছু বলতে পারলেন না । আস্তে আস্তে চলে গেলেন । আমি ত্বন্নীর পাশে এসে বসলাম । ত্বন্নীর মুখটা কি নিশ্পাপ লাগছে । সাদা ধবধবে বিছানায় শুয়ে আছে । আমি কিছুক্ষণ ওর দিক থেকে চোখ ফেরাতেই পারলাম না । এই পরীর মত মেয়েটা আমার আজ আমার জন্য এই বিছানায় শুয়ে আছে ।
যতই ত্বন্নীর উপর রাগ থাকুক ওকে ভাল তো আমি ঠিক বেসেছিলাম । জীবনের প্রথম ভালবাসার অনুভূতি তো ওর হাত ধরেই পেয়েছি । ওকে এই অবস্থায় দেখে মনের মধ্যে শান্তি কি আর লাগে ? কেন জানি নিজেকে বড় অপরাধী মনে হয় । আজ আমার কারনেই ও এখানে ।
সত্যিই সকাল বেলা ওর সাথে একটু বেশি খারাপ ব্যবহার করা হয়ে গেছে । এতো টা কঠিন আচরন না করলেও চলতো । অন্তত ভালবাসার এই দিনে তো এমন করা ঠিক হয় নি ।

সেদিনের পর ত্বন্নী প্রায়ই আমার সাথে কথা বলতে চাইতো । ক্ষমা চাইতো । এমন কি আমার সব বন্ধুদের কেও ও বিশ্বাস করিয়ে ফেলেছিল । তারা সবাই আমার কাছে ওর সুপারিশ নিয়ে আসতো । কিন্তু আমি এসব পাত্তা দিতাম না । ওকে এড়িয়ে চলতাম ।
তবে আজ সকালে ক্লাসে আসার সময় সুমন আমাকে বলল যে আজ ত্বন্নী কোন সিন ক্রিয়েট করতে পারে । সত্যি তাই করল ও । কারণও ছিল ।
আজ ভ্যালেনটাইন । ভালবাসার দিন । ক্লাস শেষে বের হতে গেলাম ত্বন্নী পথ আটকালো ।
“অপু তুমি কি এখনও আমাকে ক্ষমা করবা না ! অন্তত আজ ভালবাসার দিনে ?”
ত্বন্নীর মুখ দেখে মনে হচ্ছিল যেন ও সত্যি কথা বলছে । আমার ইগো আর সেল্ফ রিস্পেক্ট, যাতে ও চরম ভাবে আঘাত করেছে, কিছুতেই ওর কথা বিশ্বাস করতে দিলো না । বরং ওর কথা শুনে মেজাজ টা আরো খারাপ হয়ে উঠল ।
“শোন ভালবাসা কী জিনিস সেটা তোমার মত মেয়ে কোন দিন বুঝবে না । বুঝতে পারবেও না । আর আমি ? সারা জীবন যদি একা একা মরেও যেতে হয় তবুও তোমার মত মেয়ের কাছে যাবো না।”
“প্লিজ আমার কথা বিশ্বাস …”
“বিশ্বাস ? তোমাকে ? নো ওয়ে । পথ ছাড়ো । আমার কাজ আছে ।”
মুর্তির মত কিচ্ছুক্ষণ ত্বন্নী দাড়িয়ে থাকলো । তারপর আমাকে বলল “তুমি তো বিশ্বাস করলে না । আমি তোমাকে সত্যি ভালবাসি । আর তোমাকে ছাড়া বেঁচে থাকতে আমি পারবো না । এটা আমি তোমাকে বুঝিয়ে দেবো ।”
আমি হেসে ফেললাম ।
“মরে যাবে ? তুমি ? আমার জন্য ? হা হা হা !”
আমি হাসতে থাকি । পুরো ক্লাস তখন আমাদের দিকে তাকিয়ে । তখন আমার মজাই লাগছিল ।
ত্বন্নী আর কিছু বলল না । দেখলাম ওর চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল । কাঁদতে কাঁদতেই ও চলে গেলো ।
সুমন পাশেই ছিল । আমার কাছে এসে বলল “এভাবে না বললেও পারতিস !”
সত্যি কি তাই ? নিজের কাছে প্রশ্ন করলাম এভাবে না বললেও কি পারতাম ? তখন এই প্রশ্নের উত্তর জানা ছিল না । এখন ? এই কেবিনে বসে ? এখনও কি ঐ প্রশ্নটার উত্তর আমি জানি ? যখন সুমনের কাছ থেকে প্রথম খবরটা শুনি কেঁপে উঠেছিলাম । কিন্তু পরক্ষণেই আমার ঈগো মাঝখানে চলে এসছিল । আর ঈগোর কাছে আমার সব কিছু পরাজিত হয়েছিল কিন্তু এখন এই পরিস্থিতিতে আমি কী করব ? যেখানে একদিকে রয়েছে ত্বন্নীর ভালবাসা আর ওর বাবা কান্না সাথে ওর জন্য আমার মনের মধ্যে বন্দী করে রাখা ভালোবাসা। আর অন্য দিকে আমার ঈগো । কোন দিকে যাবো আমি ? হঠাৎ দেখলাম ত্বন্নীর চোখের পাতা যেন একটু কেঁপে উঠল ।
কী যেন মনে হল, ইচ্ছা হল ওর হাতটা ধরি ।
ওর হাতটা ধরলাম । মনে হল যেন ওর হাতটা খানিকটা কেঁপে উঠল । ওর হাতটা আর ছাড়লাম না ।
মনে মনে বললাম প্রথম বার ভুল করেছিলাম তোমাকে ভালবেসে । দ্বিতীয় বার ভুল করেছিলাম তোমাকে ফিরিয়ে দিয়ে । আর তৃতীয় ভুলটা করতাম যদি আজ তোমার হাতটা না ধরতাম ! কিন্তু আমি সে ভুল করিনি । এই দেখো তোমার হাতটা আমি ধরেছি ।
জানি না আমার হাত ধরার জন্যও কিনা অথবা ওর এমনিতেই এখন সেন্স ফেরার সময় হয়েছিল । ও চোখ মেলল । ও হয়তো আশা করেছিল আমি আসবো না । ওর চেহারা কেমন জানি একটা শান্তির ছায়া দেখতে পেলাম ।
ও কিছু বলার জন্য মুখ খুলতে চাইল । আমি ইশারায় কথা বলতে মানা করলাম । কথা না বললেও ও ওর দুর্বল হাত দিয়ে আমার হাত চেপে ধরতে চাইলো । আমি বুঝতে পারছি ও বল পাচ্ছে না তবুও হাতটা চেপে ধরা চেষ্টা করেই যাচ্ছে ।
আমি এবার আমার দুহাত দিয়ে ওর হাত খানি ধরলাম । ওকে আশ্বাস দিলাম যে এই হাত ছুটে যাবে না । আমি ওর হাত ধরে ওর পাশে বসে আছি । আর ও পলকহীন চোখে তাকিয়ে আছে আমার দিকে । যেন পলক ফেললেই আমি হারিয়ে যাবো ।
ওর দিকে তাকিয়ে থাকতেই দেখলাম ওর চোখ দিয়ে অশ্রুর ধারা নিচে নেমে চলেছে । নিরব অশ্রু দিয়ে যেন বলতে চাইছে আমি তোমাকে সত্যিই ভালবাসি । এই প্রান দিয়েই ভালবাসি । হঠাত্ লক্ষ্য করলাম যে আমার চোখ দিয়েও পানি পড়ছে । সাথে সাথে ওর প্রতি আমার যত রাগ ছিল ওই চোখের পানি দিয়ে সব ধুয়ে মুছে চলে গেল । ত্বন্নীর ভালবাসার কাছে আমার ঈগো পরাজিত হল । ওর চোখের জল মুছে দিতে দিতে বললাম “…..”

(প্রথম প্রকাশঃ ২২ শে অক্টোবর, ২০১১)

সামহোয়্যারইন ব্লগ লিংক

#

No responses yet

Leave a Reply

error: Content is protected !!