ভোরের আলো তখনও ফোটেনি। সেই অন্ধকারে রণবীর মিস্টার হ্যারিসনের বাড়ির পেছনের জঙ্গলে এসে দাঁড়াল। তারপর হাত দিয়ে তার ঢোলটা একবার বাজাল। তার ঘন চুলের জটায় লাল ধুলো জমে আছে, আর কোমরে একটুকরো কাপড় ছাড়া উলঙ্গ শরীরে মাখা সবুজ রং — দেখে মনে হচ্ছে যেন কোনো রঙিন দেবতা, একজন সবুজ দেবতা, জঙ্গল থেকে নেমে এসেছে। একটু পরে আবার বাজাল ঢোল, তারপর হাঁটু মুড়ে বসে রইল অপেক্ষায়।
দ্বিতীয় ঢোলের বাড়িতে রাস্টির ঘুম ভাঙল। সে শুয়ে শুয়ে কান পেতে রইল; শব্দটা স্থির বাতাস চিরে শোবার ঘরের জানালা দিয়ে ভেসে আসছে। ধুম!… এবার দ্বিগুণ বাড়ি — একটা গভীর, একটা তীক্ষ্ণ, অবিরাম, প্রশ্নের মতো…
রাস্টির মনে পড়ল তার প্রতিশ্রুতির কথা — রণবীরের সাথে হোলি খেলবে সে, ঢোলের শব্দ শুনলেই জঙ্গলে চলে আসবে। কিন্তু প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল এই শর্তে যে তার অভিভাবক ফিরে আসবেন না; এখন সেই প্রতিশ্রুতি রাখা কোনোভাবেই সম্ভব নয়, বিশেষত যে মারটা সে সবে খেয়েছে তার পর।
ধুম-ধুম, বলে উঠল জঙ্গলের ঢোল; ধুম-ধুম — অধৈর্য, রাগত।
“চুপ করে না কেন ও,” বিড়বিড় করল রাস্টি, “মিস্টার হ্যারিসনকে জাগিয়ে তুলতে চায় নাকি…”
হোলি — রঙের উৎসব, বসন্তের আগমন, নতুন বছরের পুনর্জন্ম, প্রেমের জাগরণ — এসব তার কাছে কী? এর কোনোটাই তার জীবনের সাথে জড়িত নয়। সে নতুন করে শুরু করতে পারে না, একটা দিনের জন্যও না… আর তাছাড়া, রং ছোড়া আর ঢোল পেটানো — এসব তো বড্ড আদিম ব্যাপার মনে হয়…
ধুম-ধুম!
ছেলেটা বিছানায় উঠে বসল।চ
আকাশ কিছুটা ফিকে হয়ে আসছে।
দূর বাজার থেকে ভেসে আসছে নতুন সুর — অনেক ঢোল, অনেক কণ্ঠস্বর; ক্ষীণ কিন্তু অবিচল, ক্রমেই ছন্দে ও উত্তেজনায় জেগে উঠছে। সেই শব্দ রাস্টির ভেতর কীসের যেন সাড়া জাগাল — কোনো এক বুনো, আবেগময় কিছু, যা তার স্বপ্নের জগতেরই অংশ। হঠাৎ এক অদম্য তাড়নায় সে বিছানা থেকে লাফ দিয়ে নামল।
দরজার কাছে গিয়ে কান পাতল — বাড়ি নিঝুম। খিল এঁটে দিল। হোলির রং পোশাক নষ্ট করে দেবে জেনে পায়জামা আর খুলল না সে। পুরনো ক্ষয়ে যাওয়া রবারসোলের টেনিস জুতো পরে জানালা দিয়ে বেরিয়ে পড়ল, শিশিরভেজা ঘাসের উপর দিয়ে দৌড়াল, বাড়ির পেছনের পথ ধরে, পাহাড় পেরিয়ে, সোজা জঙ্গলের ভেতর।
রণবীর ছেলেটাকে আসতে দেখে উঠে দাঁড়াল। লম্বা হাতলের ঢোলটা — ঢোলক — ঝুলছে তার কোমরে। সে উঠল, সূর্যও উঠল। কিন্তু সূর্যকে ততটা দীপ্তিমান মনে হল না, যতটা মনে হল রণবীরকে — রাস্টির চোখে সে দেবতার মতো নয়, বরং এক রঙিন অসুরের মতো। “দেরি করলে মিস্টার,” বলল রণবীর, “ভাবলাম আর আসবেই না।”
দুটো মুঠো বন্ধ ছিল তার, কিন্তু রাস্টির দিকে এগিয়ে আসতে আসতে সে মুঠো খুলল — মুখে চওড়া হাসি, সবুজ মুখে সাদা দাঁতের ঝলক। ডান হাতে লাল আবির, বাঁ হাতে সবুজ। ডান হাত দিয়ে সে রাস্টির বাঁ গালে মাখাল লাল, তারপর বাঁ হাত দিয়ে ডান গালে দিল সবুজ। তারপর একটু পিছিয়ে রাস্টিকে দেখল, হো হো করে হাসল। তারপর রীতিমতো কোলাকুলি করল সে — একেবারে কুস্তিগীরের কায়দায়। হতভম্ব রাস্টি ব্যথায় নিঃশ্বাস আটকে গেল।
“চল,” বলল রণবীর, “শহরটাকে রঙধনু বানিয়ে দিই।”
আর সত্যি সত্যিই, সেদিন বসন্ত যেন উপচে পড়ল।
সূর্য উঠল, বাজার জেগে উঠল। বাড়ির দেওয়ালগুলো হঠাৎ রঙের ছিটায় ছোপ ছোপ হয়ে গেল, আর ঠিক তেমনি হঠাৎ মনে হল গাছগুলো ফুলে ফুলে ফেটে পড়েছে — জঙ্গলে জঙ্গলে রডোডেন্ড্রনের বাহিনী, নদীর ধারে পয়েনসেটিয়া দুলছে নেচে নেচে; চেরি আর বরই গাছে ফুটেছে ফুল; পাহাড়ের বরফ গলে গেছে আর ঝরনাগুলো ছুটছে খরস্রোতে; গাছের নতুন পাতায় মিষ্টির আভাস, কচি ঘাসে একসাথে শিশির আর রোদ, আর প্রতিটা শিশিরবিন্দু যেন একটুকরো পান্না।
বসন্তের এই সংক্রামক আনন্দ একসাথে ছড়িয়ে পড়ল মানুষের জগতে আর প্রকৃতির জগতে — আর দুটো জগৎ মিলে হয়ে গেল একটাই।
রণবীর আর রাস্টি পাহাড়ের গা বেয়ে এগিয়ে চলল, জঙ্গলের কিনারা ধরে, ইউরোপিয়ানদের পাড়া আর চকচকে বাজার দুটোকেই পাশ কাটিয়ে। তারা এল নোংরা ছোট ছোট গলিতে — যেখানে বাড়ির দেওয়ালগুলো বছরের পর বছর দারিদ্র্যের ঘষায় ক্লান্ত, সেই দেওয়ালগুলোই এখন আবার রঙিন হয়ে উঠেছে হোলির তীব্র রঙে। তারা এসে পৌঁছাল ক্লক টাওয়ারে।
ক্লক টাওয়ারে বসন্তের দরবার সত্যিকার অর্থেই বসে গেছে। রঙিন ধুলোর মেঘ উড়ছে হাওয়ায়, ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে, আর সবুজ-কমলা-বেগুনি রঙের জলের ধারা — সব গাঢ়, আবেগঘন রং — ফিনকি দিয়ে বেরোচ্ছে এখানে-সেখানে। ছেলেমেয়েরা দল বেঁধেছে। তাদের হাতে অস্ত্র বলতে সাইকেলের পাম্প, নয়তো বাঁশের নল দিয়ে বানানো পিচকারি — সেখান থেকে তরল রং ছিটকে যাচ্ছে। শিশুর দল মিছিল করে চলেছে মূল রাস্তা ধরে, কণ্ঠ ছেড়ে গান গাইছে, হাততালি দিচ্ছে। বড়রা জলের চেয়ে আবিরকেই বেশি ভালোবাসে। তারাও গাইছে, কিন্তু তাদের গানে আছে গভীর অর্থ, তাদের হাত আর আঙুল তুলছে বসন্তের তাল — সেই একই তাল, সেই একই গান, যা প্রতি বছর এই দিনটিরই নিজস্ব সম্পদ।
রণবীর তার কিছু বন্ধুর দেখা পেল, হইহই করে স্বাগত জানাল তারা। একটা সাইকেল পাম্প তাক করা হল রাস্টির দিকে, আর কালো কুচকুচে জলের একটা ধারা সোজা এসে লাগল তার মুখে।
এক মুহূর্তের জন্য চোখে কিছুই দেখতে পেল না রাস্টি, হতভম্ব হয়ে হোঁচট খেতে খেতে এদিক-ওদিক ছুটল। একদল ছেলেমেয়ে তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল, চারদিক থেকে পাম্পের পর পাম্প চলতে লাগল তার গায়ে। জামা আর পায়জামা ভিজে চুপচুপে হয়ে চামড়ার সাথে লেপটে গেল; তারপর কেউ একজন জামার কোণ ধরে টানতে লাগল, টানতে টানতে ছিঁড়েই ফেলল। ছেলেটার গায়ে, মুখে, সারা শরীরে আবির ছোড়া হল — জোরে, নির্দয়ভাবে। কোমল, রোদহীন সেই চামড়া এই আক্রমণে জ্বলতে লাগল।
তারপর চোখ পরিষ্কার হল। পলক ফেলে সে চারদিকে তাকাল — ছেলেমেয়ের দল তার সামনে নাচছে, চেঁচাচ্ছে। তার গা বেয়ে গড়াচ্ছে কালো কুচকুচে রং, তার মধ্যে লালের ডোরা, মুখের ভেতরেও যেন সেই রং ঢুকে গেছে — সে থুথু ফেলতে লাগল।
তারপর একে একে রণবীরের বন্ধুরা এগিয়ে এল রাস্টির কাছে।
আলতো হাতে তারা রাস্টির গালে আবির মাখাল, জড়িয়ে ধরল তাকে। দাউদাউ জ্বলন্ত দানবের মতো এত রঙিন তারা যে রাস্টি একজন থেকে আরেকজনকে আলাদা করতেই পারল না। কিন্তু পাম্পের সেই হিংস্র আক্রমণের ঠিক পরেই এই কোমল স্বাগত — এতে রাস্টি আরও বেশি বিভ্রান্ত হয়ে পড়ল।
রণবীর বলল, “এখন তুমি আমাদেরই একজন — চল।” আর রাস্টি চলল তার সাথে, বাকিদের সাথে।
“সুরি লুকিয়ে আছে,” কেউ একজন চেঁচিয়ে উঠল। “নিজেকে ঘরে বন্ধ করে রেখেছে, হোলি খেলবে না।”
“খেলতে হবেই,” বলল রণবীর, “দরকার হলে ঘর ভেঙে ফেলব।”
সুরি হোলিকে ভয় পেত প্রাণের চেয়েও বেশি। সে ঠিক করেছিল সারাটা দিন অবরোধের মধ্যে কাটাবে। মায়ের রান্নাঘরে সে ঘাঁটি গেড়েছে — সারাদিনের খাবার মজুত। উঠোন থেকে বন্ধুরা ডাকছে, সে কান দিচ্ছে না — ডাক হোক, ঠাট্টা হোক, ভয় দেখানো হোক — কিছুতেই কাজ নেই, দরজা শক্ত, খিল আঁটা। সে টেবিলের নিচে আয়েশ করে বসে পাতা উল্টাতে লাগল ইংরেজি নিউডিস্টদের পত্রিকার — যেটা সে প্রতি মাসে কেনে, মূলত ছবির লোভে।
কিন্তু বাইরের দলটা ঢোলের বাড়িতে, হইহল্লায়, উৎসবের নেশায় মাতাল — সুরিকে না জব্দ করে তারা ছাড়বে কেন? একটা মই জোগাড় হল, আর রোশনদানি দিয়ে রান্নাঘরে ঢুকে পড়ল সবাই।
সুরি ভয়ে চিৎকার করে উঠল। দরজা খুলে গেল, তাকে টানতে টানতে বাইরে বের করা হল। তার চশমা মাটিতে পড়ে গেল, পায়ের তলায় পিষে গেল।
“আমার চশমা!” সে চেঁচিয়ে উঠল। “ভেঙে ফেললে!”
“বারোটা চশমা কিনতে পারিস তুই!” তার প্রতিপক্ষদের একজন বিদ্রূপ করল।
“কিন্তু দেখতে পাচ্ছি না আমি, বোকার দল, দেখতে পাচ্ছি না!”
“দেখতে পাচ্ছে না!” কেউ একজন তাচ্ছিল্যের সুরে বলে উঠল। “জীবনে এই প্রথমবার সুরি দেখতে পাচ্ছে না কী হচ্ছে! এরপর থেকে যতবার গুপ্তচরগিরি করতে আসবি, ততবার চশমা ভাঙব!”
সুরিকে বিশেষ চেনে না রাস্টি, তবু ছটফটানো ছেলেটার জন্য মায়া লাগল তার।
“ছেড়ে দাও না ওকে,” সে রণবীরকে বলল। “খেলতে না চাইলে জোর কেন?”
“কিন্তু ওর সব ছলচাতুরির বদলা নেওয়ার এটাই একমাত্র সুযোগ। বছরের এই একটাই দিন যেদিন কেউ ওকে ভয় পায় না!”
ফ্যাকাশে, হাড়সর্বস্ব, সরু সরু পা — প্রায় ছিঁড়ে ফেলার মতো টানাহেঁচড়া হচ্ছে যে ছেলেটা, তাকে কেউ ভয় পেতে পারে এটা রাস্টির কাছে কল্পনাতীত মনে হল। বাকিরা যখন ওকে ছেড়ে দিল, রাস্টি স্বস্তি পেল।
সারাটা দিন রাস্টি রণবীর আর তার বন্ধুদের সাথে ঘুরে বেড়াল শহরে আর শহরের বাইরে, আর সুরির কথা কখন ভুলেই গেল সবাই। সেদিন একটা দিনের জন্য রণবীর আর তার বন্ধুরা ভুলে গেল ঘর, কাজ, পরের বেলার ভাত — আর নাচতে নাচতে এগিয়ে গেল রাস্তা ধরে, শহর পেরিয়ে, জঙ্গলের ভেতরে। আর সেই একটা দিনের জন্য রাস্টি ভুলে গেল তার অভিভাবককে, মিশনারির স্ত্রীকে, নমনীয় বেতের ছড়িকে — আর ছুটল সবার সাথে, শহর পেরিয়ে, জঙ্গলের ভেতরে।
ঝকঝকে রোদেলা সকাল পেকে উঠল বিকেলে।
জঙ্গলের ভেতরে, শীতল অন্ধকার নীরবতায়, গান আর চিৎকার থেমে গেল হঠাৎ — সবাই হাঁপিয়ে পড়েছে। তারা শুয়ে পড়ল অনেক গাছের ছায়ায়, ঘাস নরম আর আরামদায়ক — আর অল্পক্ষণের মধ্যেই রাস্টি ছাড়া সবাই ঘুমিয়ে পড়ল।
রাস্টি ক্লান্ত। রাস্টি ক্ষুধার্ত। জামা আর জুতো হারিয়ে গেছে, পা ছিলে গেছে, সারা গায়ে ব্যথা। এতক্ষণে বিশ্রামে বসে সে টের পাচ্ছে এসব — কারণ সারাদিন রঙের খেলার উত্তেজনায় সে ভেসে গিয়েছিল, এক অজানা আনন্দের জোয়ারে ডুবে ছিল যা সে আগে কখনো জানেনি। তার সোনালি চুল এলোমেলো, রঙে রঙে ছোপানো, আর চোখ দুটো বিস্ময়ে বড় বড়।
এখন সে ক্লান্ত, কিন্তু সে সুখী।
এই দিনটা যেন কখনো শেষ না হয় — এই উত্তাপময় আবেগের দিন, এই অন্য এক জগতের জীবন। জঙ্গল ছেড়ে যেতে চাইছে না সে; এখানে নিরাপদ, এই মাটি তাকে সান্ত্বনা দিচ্ছে, আঁকড়ে ধরছে — শরীরের ব্যথাও যেন এখানে সুখে পরিণত হয়ে যাচ্ছে…
বাড়ি ফিরতে চাইছে না সে।
*রাসকিন বন্ডের ‘দ্য রুম অন দ্য রুফ’ উপন্যাস থেকে।