রাতটা শুরু থেকেই অদ্ভুত ছিল। গ্রামের সেই পুরোনো বাড়িটা দিনের আলোয় যতটা নিরীহ লাগে, রাত নামলেই যেন অন্য কিছু হয়ে ওঠে। রায়হান প্রথমে এসব বিশ্বাস করত না। শহর থেকে এসেছে, ভূত-টুত তার কাছে গল্প ছাড়া কিছু না।
কিন্তু সেদিন রাতেই তার ধারণা বদলে গেল।
ঘড়িতে তখন ঠিক বারোটা। হঠাৎই বাড়ির ভেতর থেকে “টক… টক… টক…” শব্দটা ভেসে এল। যেন কেউ ধীরে ধীরে কাঠের দরজায় নক করছে। রায়হান ভাবল হয়তো বাতাসের শব্দ। কিন্তু শব্দটা থামল না—বরং আরও নিয়মিত হতে লাগল।
সে উঠে দরজার কাছে গেল। দরজাটা খুলে বাইরে তাকাল। চারপাশে নিস্তব্ধতা, কেবল দূরের বাঁশঝাড়ে বাতাসের শব্দ। কেউ নেই।
দরজা বন্ধ করে ঘুরতেই তার বুকটা ধক করে উঠল।
ঘরের কোণায় একটা ছায়া দাঁড়িয়ে আছে।
“কে?” কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করল সে।
কোনো উত্তর নেই। শুধু ছায়াটা একটু একটু করে বড় হতে লাগল, যেন অন্ধকার থেকেই জন্ম নিচ্ছে। রায়হান চোখ কচলাল। এটা কি তার কল্পনা?
হঠাৎ ছায়াটা নড়ল।
ধীরে… খুব ধীরে… সেটা দেয়াল বেয়ে উঠে ছাদের দিকে যেতে লাগল, যেন কোনো মানুষ নয়, বরং অন্ধকার নিজেই জীবন্ত হয়ে গেছে।
রায়হানের গলা শুকিয়ে গেল। সে চিৎকার করতে চাইল, কিন্তু গলা দিয়ে কোনো শব্দ বের হল না।
ঠিক তখনই তার কানের কাছে কেউ ফিসফিস করে বলল—
“তুমি আমার জায়গায় ঘুমাচ্ছ…”
সে ঝট করে ঘুরল। কেউ নেই।
আবার সেই ফিসফিসানি—
“এই বিছানাটা… আমার…”
রায়হান দৌড়ে দরজার দিকে গেল, কিন্তু দরজাটা যেন বাইরে থেকে বন্ধ। সে জোরে ধাক্কা দিল, খুলল না। পেছনে তাকাতেই দেখল—ছায়াটা এখন তার ঠিক পেছনে দাঁড়িয়ে।
কোনো মুখ নেই, কোনো চোখ নেই—তবুও সে বুঝতে পারছে, ওটা তাকে দেখছে।
হঠাৎ ঠাণ্ডা একটা হাত তার কাঁধে ছুঁয়ে গেল।
পরের দিন সকালে গ্রামের লোকজন দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে দেখল—ঘরটা একেবারে ফাঁকা। রায়হানের কোনো চিহ্ন নেই।
শুধু বিছানার ওপর ধুলোর মধ্যে আঙুল দিয়ে লেখা একটা বাক্য—
“এবার আমি ঘুমাবো।”
—