বাংলাদেশের অর্থনীতিতে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ ও উত্তেজনা এখন সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা ও পণ্য পরিবহনে অস্থিরতা সৃষ্টি হওয়ায় দেশের আমদানি খরচ বেড়ে যাচ্ছে এবং রপ্তানি বাণিজ্যও হুমকির মুখে পড়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে গ্যাসের দাম প্রায় ৫০ শতাংশ এবং অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় ১০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা আরও তীব্র হয়েছে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে জাহাজ চলাচলের ঝুঁকির কারণে। হরমুজ প্রণালীসহ গুরুত্বপূর্ণ রুটে বিঘ্ন ঘটায় বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশে নতুন চাপ তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে এলএনজি এবং জ্বালানি তেলের উপর অত্যধিক নির্ভরতার কারণে দীর্ঘমেয়াদি সংকট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, মুদ্রাস্ফীতি এবং রপ্তানি খাতের উৎপাদন ক্ষমতাকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করতে পারে। বিকেএমইএ-এর নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান সতর্ক করে বলেছেন, হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। এ অবস্থা অব্যাহত থাকলে এলএনজি সংকট আরও গভীর হবে। তিনি মনে করেন, সরকারকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বড় শিল্প খাতে, বিশেষ করে টেক্সটাইল মিল, ডাইং ও ওয়াশিং ইউনিটগুলোতে গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। গ্যাসের দাম বা সরবরাহ কমলে উৎপাদন ব্যাহত হবে, যা সময়মতো পণ্য সরবরাহে বাধা সৃষ্টি করবে এবং ক্রেতাদের আস্থা হারানোর ঝুঁকি তৈরি করবে। বিসিআই সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী বলেন, এ সংকটের প্রভাব বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়বে, যার ফলে মুদ্রাস্ফীতি বাড়বে। বাংলাদেশের রপ্তানি খাত ইতিমধ্যে নানা চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সংকট যদি ১০ দিনের বেশি স্থায়ী হয়, তাহলে নতুন অর্ডার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে। জাহাজের জ্বালানি খরচ বৃদ্ধি এবং বিকল্প দীর্ঘ পথ ব্যবহারের কারণে শিপিং ভাড়াও বাড়বে।ইতোমধ্যে মৌসুমি ফল-সবজি রপ্তানিতে সরাসরি প্রভাব পড়েছে। বিমান কার্গো বিঘ্নিত হওয়ায় গত শনিবার থেকে সবজি রপ্তানির প্রায় ৯০ শতাংশ থমকে গেছে। স্মরণিকা ইন্টারন্যাশনালের মালিক মাসুদুর রহমান জানান, তার প্রতিষ্ঠান সপ্তাহে ১০-১২ টন পণ্য রপ্তানি করত, কিন্তু এখন তা পুরোপুরি বন্ধ। দ্রুত পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে ব্যবসায়ীরা বড় লোকসানের মুখে পড়বেন এবং বাজার প্রতিযোগীদের হাতে চলে যাবে। শীতকালে বাংলাদেশ থেকে প্রতিদিন গড়ে ৩৫-৪০ টন সবজি রপ্তানি হয়, যার বড় অংশ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোসহ ইউরোপ-আমেরিকায় যায়। পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, তেলের দাম ক্রমাগত বাড়লে চলতি হিসাবের ঘাটতি বাড়বে, টাকার মান কমবে এবং আমদানি ও ঋণ পরিশোধের বোঝা ভারী হবে। অর্থায়নের খরচ বৃদ্ধিতে ক্ষুদ্র-মাঝারি রপ্তানিকারকরা চলতি মূলধন সংকটে পড়বেন। স্প্যারো গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শোভন ইসলামও একই উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধি শুধু কারখানায় সীমাবদ্ধ থাকবে না, পুরো অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়বে। দীর্ঘমেয়াদি সংকট ক্ষুদ্র-মাঝারি রপ্তানিমুখী শিল্পের অস্তিত্বকেই বিপন্ন করতে পারে।একজন জ্যেষ্ঠ পোশাক রপ্তানিকারকের মতে, উচ্চ জ্বালানি দাম ও বৈশ্বিক অর্থায়ন খরচ বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।