অনলাইন বুলিং: নারী শিল্পীদের অদৃশ্য যন্ত্রণা

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম শিল্পীদের জন্য একদিকে যেমন সুযোগ ও জনপ্রিয়তা বাড়িয়েছে, অন্যদিকে তেমনি অনেকের জীবনে গভীর যন্ত্রণা ও আতঙ্কের উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে নারী শিল্পীদের ক্ষেত্রে এই সমস্যা অনেক বেশি তীব্র।

বিভিন্ন গণমাধ্যম ও জরিপ থেকে জানা যায় যে, বাংলাদেশে অনলাইনে হয়রানির শিকার নারীদের হার ৫৯ থেকে ৬৩.৫ শতাংশ পর্যন্ত, এবং এর একটি উল্লেখযোগ্য অংশ শোবিজ জগতের নারীদের। ইউএন ওমেনের তথ্য অনুসারে, প্রতি ১০ জন নারীর মধ্যে একজন এ ধরনের অনলাইন নির্যাতনের কারণে গুরুতর ডিপ্রেশনে ভুগছেন। বাংলাদেশ ব্যুরো অব স্ট্যাটিস্টিকসের ২০২৪ সালের জরিপে দেখা গেছে, ২০-২৪ বছর বয়সী নারীদের মধ্যে এই হার ১৬ শতাংশ।

সাইবার বুলিংয়ের সাধারণ রূপগুলোর মধ্যে রয়েছে—মিথ্যা গুজব ছড়িয়ে চরিত্র হনন, শরীরের গঠন নিয়ে কটূক্তি, ডিপফেক প্রযুক্তি ব্যবহার করে অশ্লীল ভিডিও তৈরি, পোশাক বা অন্যান্য বিষয়ে ধর্মীয়-নৈতিক ভিত্তিতে আক্রমণ ইত্যাদি। এসবের ফলে শিল্পীরা প্রচণ্ড মানসিক চাপ, অবসাদ, রাগ-বিরক্তি এবং কখনো কখনো প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে দেওয়ার মতো পরিস্থিতির মুখোমুখি হন।

অভিনেত্রী মেহজাবীন চৌধুরী একাধিকবার এমন আক্রমণের শিকার হয়েছেন, বিশেষ করে বিদেশ ভ্রমণের ছবি বা পোশাক নিয়ে নৈতিকতার নামে সমালোচনা করে। নুসরাত ইমরোজ তিশা ‘মাই নাম্বার, মাই রুলস’ ক্যাম্পেইনে জানিয়েছেন, তিনি গড়ে প্রতিদিন ৯ বার সাইবার বুলিংয়ের মুখোমুখি হন। একই ক্যাম্পেইনে রুনা খান ২৪, শবনম ফারিয়া ১০০, মৌসুমী হামিদ ৭২ বারের মতো অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। আশনা হাবিব ভাবনা হাতে ‘৯৯’ লিখে পোস্ট করে এই আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন, কিন্তু তারপরও অশ্লীল মন্তব্যের শিকার হন।

পরীমণি ব্যক্তিগত জীবন ও মামলার কারণে বারবার ট্রোলিংয়ের মুখে পড়েছেন। তিনি বলেছেন, অনেক সময় এগুলোকে উপেক্ষা করলেও মাঝেমধ্যে অসহায়ত্ব অনুভব করেন। তাসনিয়া ফারিণ ভুল খবরের কারণে অনলাইনে তীব্র সমালোচনার শিকার হয়েছেন। সাদিয়া আয়মান ডিপফেক অশ্লীল ভিডিওর শিকার হয়েছেন।

আজমেরী হক বাঁধন কান চলচ্চিত্র উৎসবসহ আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন, কিন্তু পোশাক ও সিঙ্গেল মাদার হওয়ার কারণে ট্রলিং সহ্য করতে হয়েছে। তিনি জানিয়েছেন, ৪৩ বছর বয়সে তিনি এসবের বিরুদ্ধে মানসিক প্রতিরোধ গড়ে তুলেছেন, কিন্তু কিশোর-কিশোরীদের জন্য এটা অনেক কঠিন।

রাফিয়াথ রশিদ মিথিলা প্রায়ই এ ধরনের হয়রানির শিকার হন। আইনি পদক্ষেপ নিয়ে কয়েকটি আইডির আইপি ট্র্যাক করেও অপরাধীদের শনাক্ত করা যায়নি। এমনকি শক্ত মানসিকতার এই শিল্পীও প্যানিক অ্যাটাক ও ট্রমার শিকার হয়েছেন।

নুসরাত ফারিয়া ফ্যাশন ও চেহারা নিয়ে ট্রোল হন, এবং ‘মুজিব: একটি জাতির রূপকার’ ছবিতে শেখ হাসিনার চরিত্রে অভিনয়ের পর আক্রমণ আরও বেড়েছে। তিনি বলেন, চুপ থাকলে ট্রোলাররা আরও উৎসাহ পায়, তাই তিনি প্রতিবাদ করেন।

সরকার এই সমস্যা মোকাবিলায় সাইবার নিরাপত্তা আইন (২০২৫) এবং পর্নোগ্রাফি কন্ট্রোল অ্যাক্ট (২০১২) প্রণয়ন করেছে। পুলিশের ‘সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন’ ইউনিটও রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এসব আইনের কার্যকর প্রয়োগ এখনও খুবই সীমিত।

Leave a Comment